বিস্ময়কর এক ছবি

আটলান্টিস থেকে তোলা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন

ছবিটা দেখে বিস্মিত না হয়ে কোন উপায় ছিল না। এই ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখে তোলা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ছবি। কক্ষপথ থেকে পৃথিবীকে দেখতে কেমন লাগে বা মহাশূন্যটা আসলে কেমন এ নিয়ে মনে যত অদ্ভুত কল্পনাবিলাস ছিল সবকিছুর এক চমৎকার সমাধান হয়ে গেল দেখা মাত্র। মহাকাশ যে মানুষের কল্পনার কিছু না বরং জলজ্যান্ত এক বাস্তবতা এটি বুঝতে হলে স্থিরচিত্রটি দেখার কোন বিকল্প নেই। রাস্তায় দাড়িয়ে একটি সুউচ্চ দালান বা বিরাট কাঠামোর দিকে তাকালে যেমন তেমন কিছু মনে হয় না, কারণ এটা তো প্রত্যক্ষ বাস্তবতা, তেমনই এই ছবিটি দেখে একদিক দিয়ে তেমন কিছু মনে হবে না। কারণ মহাশূন্যে বসবাস বা মহাকাশ ভ্রমণ তখন জলজ্যান্ত বাস্তবতা হয়ে ধরা দেবে। পুরো মহাকাশ স্টেশনটি দেখা যাচ্ছে এবং পেছনের দৃশ্যপটে ভেসে রয়েছে অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী। এর আগে শিল্পীর তুলিতে আঁকা মহাকাশ স্টেশনের ছবি দেখেছি। এটি প্রথমে দেখে তাই ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, না জানি কোন বিরাট শিল্পীর হাতের ছোয়া লেগেছে এতে। সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছি আশ্চর্য পৃথিবীর রূপ দেখে। পরিবেশ আন্দোলনের মাধ্যমে একে জ্যান্ত রাখা যে কতটা দরকার তার মর্মার্থও বুঝে গেছি তৎক্ষণাৎ।

ছবিটি তোলা এবং তার সুষ্ঠু বন্টন করার পূর্ণ কৃতিত্ব অবশ্যই নাসার। তাই প্রথমেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিচ্ছি নাসার কাছে। নাসার সবচেয়ে বিপ্লবী পদক্ষেপ হচ্ছে, তাদের তোলা প্রায় সব ছবির স্বত্ব ত্যাগ করা। নাসার এই ছবিগুলোর স্বত্বের বিষয়ে উল্লেখ করা আছে, “নাসার কোন ম্যাটারিয়ালেরই স্বত্ব নেই, যদি না বিশেষভাবে কোথাও স্বত্বের কথা উল্লেখ করা হয়।” সে সুবাদেই নাসার তোলা এই ছবিটি উইকিমিডিয়া কমন্সে স্থান পেয়েছে। সাথে সাথে স্থান পেয়েছে ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়াতে “আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন” নিবন্ধের তথ্যছকে। ছবি তোলার কাহিনীটা এবার ভেঙে বলা দরকার।

১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। এতোদিনে প্রায় স্বকীয়তা অর্জন করে ফেলেছে, তথাপি কাজের কোন শেষ নেই। নিয়তই সেখানে নতুন নতুন অভিযান প্রেরণ করা হচ্ছে যার অধিকাংশই নভোখেয়াযান তথা স্পেস শাট্‌লের মাধ্যমে। ২০০৮ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি “এসটিএস-১২২” নামের এমনই একটি অভিযান শুরু হয়। অভিযানটি প্রেরিত হয় “আটলান্টিস নভোখেয়াযান”-এর মাধ্যমে। ৮ জন ক্রু নিয়ে ঐ দিনই স্টেশনে পৌঁছায় আটলান্টিস। স্টেশনের বিশেষ রোবট নিয়ন্ত্রিত বাহুর মাধ্যমে এটি স্টেশনের সাথে যুক্ত হয়। তারপর মূল কাজ শুরু হয়। মূল কাজটি ছিল আইএসএস-এ “কলাম্বাস গবেষণাগার” যুক্ত করা। স্টেশনে বিজ্ঞানীদের গবেষণা কাজের সুবিধার জন্য ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি এই মডিউল গবেষণাগারটি তৈরী করেছে। পুরো যুক্তকরণ কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করেছে আটলান্টিস ও এর ক্রুরা। তারপর শুরু হয়েছে ফেরার আয়োজন। ১৮ই ফেব্রুয়ারি স্টেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে আটলান্টিস। বিচ্ছিন্ন হয় কিছুদূর যাবার পরই তার মাথায় বুদ্ধিটা এল। একটি অসাধারণ ছবি তুলে ফেলল স্টেশনের, পৃথিবীর পুরো ভিউ সহ। উল্লেখ্য ২০শে ফেব্রুয়ারি এটি পৃথিবীতে ফিরে আসে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তথা আইএসএস-এর কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তাই বর্তমান ছবিটিকে অনেকাংশেই পূর্ণাঙ্গ বলা যেতে পারে। সূর্যের তীব্র আলোয় ছবির সবকিছু খুব স্পষ্ট এসেছে। এই ছবি দেখে স্টেশনের কাঠামো বলে দেয়া যায়: মাঝখানের অনুভূমিক কাঠামোটিকে মেরুদণ্ড হিসেবে ধরে নেয়া যায়, লম্বা লম্বা চাকতিগুলো হল সৌর প্যানেল যা দিয়ে সৌর বিদ্যুৎ উঃপাদন করা হয়, একেবারে মাঝের উল্লম্ব কাঠামোর নিচের অংশ হল আবাসিক এলাকা যেখানে বিজ্ঞানী ও ক্রুরা থাকেন এবং উপরের অংশ হল গবেষণাগার। কলাম্বাসকেও এই উপরের অংশে লাগানো হয়েছে। পিছনে পৃথিবী দেখা যাচ্ছে: একেবারে সাদা ধবধবে অংশগুলো মেঘ, নীল সাগর আর ভূমির আভাও বোঝা যাচ্ছে।

এই ছবি যে কাউকে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখাতে পারে বলে মনে হল। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগেও এমন মহাকাশ স্টেশনের ধারণা পুরোপুরি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ছিল। আজ তা বাস্তব হলেও আমরা সেই প্রাচীন কল্পকাহিনী দিয়ে তা চিন্তা করে থাকি। মহাকাশের বাস্তবতা বুঝতে একসময় স্পেস অডিসির মত মুভি দেখতে হতো, আর এখন এ ধরণের ব্যতিক্রমী স্থিরচিত্র আর নাসার প্রামাণ্য চিত্র দেখলেই চলবে। মহাকাশে উপনিবেশ স্থাপনের প্রথম প্রক্রিয়া হিসেবে এই স্টেশনকে আখ্যায়িত করা যায়। বিজ্ঞানীরা এখন আবার মহাকাশ স্টেশন থেকে পৃথিবী পর্যন্ত লিফ্‌ট তৈরীর কথা ভাবছেন যাকে “স্পেস এলিভেটর” বলা হয়েছে। এটি তৈরী হয়ে গেলে কষ্ট করে পৃথিবী থেকে স্টেশনে নভোখেয়াযান পাঠাতে হবে না। বরং স্টেশনে বসেই নতুন নতুন সব গবেষণা ও নভোযান তৈরী করা যাবে; সাথে বেঁচে যাবে মুক্তি বেগ অতিক্রমের অতিরিক্ত খরচ। এসব আর কল্পবিজ্ঞান নেই, পুরোপুরি বাস্তব।

About Khan Muhammad

A man's heart has heard two ways through life- the way of nature and the way of grace. You have to choose which one you'll follow. Grace doesn't try to please itself. It accepts being slighted, forgotten, disliked. It accepts insults and injuries. Nature only wants to please itself, get others to please it too. It likes to lord it over them; to have its own way. It finds reasons to be unhappy when all the world is shining around it and love is smiling through all things. They taught us, that no one who loves the way of grace, ever comes to a bad end.
This entry was posted in ছবি ব্লগ, মহাকাশ অভিযান and tagged , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to বিস্ময়কর এক ছবি

  1. Muhammad says:

    এই লেখাটি সচলায়তনেও পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে ৮-১০টি মন্তব্য পেয়েছে। বিজ্ঞানপুরীর কিছু লেখা সচলায়তনে প্রকাশ করা হবে এখন থেকে।

  2. অসাধারন একটা ছবি…কল্পনার বাস্তব রূপ…
    তারচে অসাধারন, ছবির বর্ননা… !

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s