নিষ্পাদনী পরিচয়

জার্মানির গ্যটিঙেন বাস্তবিক অর্থেই একটি বহুজাতিক উপশহর। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই শহর, বলা যায় শহরের অধিকাংশ অধিবাসী হয় শিক্ষার্থী নয় শিক্ষক। পৃথিবীর অন্য কোন শহরের কেন্দ্রভাগে এত ছাত্র থাকে কিনা সন্দেহ আছে। জার্মানির নিডারজাখসেন প্রদেশের এই ছোট্ট শহরটিতে হয় না এমন কিছু নেই। পৃথিবীর খুব কম দেশই বোধহয় আছে যেদেশের কোন না কোন শিক্ষার্থী নেই এখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডগুলোও সেদিক থেকে বেশ আন্তর্জাতিক ঢঙের। যেমন এখানে Modern Indian Studies নামে একটি গোটা বিভাগই রয়েছে। আধুনিক ভারতীয় শিক্ষা এবং নৃবিজ্ঞান বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এই ১৫ থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে হয়ে গেল নৃবিজ্ঞানের একটি কর্মশালা যার শিরোনাম ছিল, “Performing Identity: Ethnicity and Ethno-Nationalism in the South-East Asia Borderland region of North-East India” যার বাংলা করলে দাঁড়ায় “নিষ্পাদনী পরিচয়: উত্তর-পূর্ব ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সীমান্ত অঞ্চলে নৃগোষ্ঠী এবং নৃ-জাতীয়তা”।

কর্মশালার মূল উদ্যোক্তা আসামের মিনাক্ষী বরকতকি, যিনি এক সময় অক্সফোর্ডে গণিতের উপর পড়াশোনা করলেও মধ্য বয়সে এখন সব ছেড়েছুড়ে গোটিঙেনে নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি শুরু করেছেন। একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীর উদ্যোগে এত উঁচু মানের একটি কর্মশালা পরিচালনা সত্যিই বিস্ময়কর। গ্যটিঙেনে আমার জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান প্রোগ্রামে আসামের একজন আছে যার সুবাদেই কর্মশালায় একদিনের জন্য যেতে পারলাম। আমার যাওয়ার মূল কারণ ছিল চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক আলোচনা শোনা এবং সম্ভব হলে অংশ নেয়া। ১৭ই ডিসেম্বর সাড়ে এগারটা থেকে ১টা পর্যন্ত পুরো সময়ই বাংলাদেশ বিষয়ক আলোচনা। আরও বড় প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেট এবং আসাম-মেঘালয় অঞ্চলের অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস নিয়েও কিছু আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। ব্রোশারে দেখলাম “Northeast and Beyond” প্যানেলে মোট আলোচনা হবে তিনটি:

১। Performing Anthropological Identity: J. P. Mills and the Chittagong Hill Tracts – Wolfgang Mey
২। Climate, Commerce and Bureaucracy: Founding Colonial Rule in Northern East Bengal – Gunnel Cederlöf
৩। “They are Taking our Land”: A Comparative Perspective on Indigeneity and Alterity in Meghalaya and the Chittagong Hill Tracts – Ellen Bal & Eva Gerharz

জে পি মিলস ও চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকা
- ভোলফগাং মেই

প্রথমে শুরু করলেন ভোলফগাং মেই, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের। এই বক্তৃতার আগে আসলে আমি জে পি মিলসের নামও জানতাম না। ২০ মিনিটের এই বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় মিলসের কর্মকাণ্ড এবং পরবর্তীতে তার তোলা ছবি, তার ব্যক্তিগত ডায়রি ও নৃতাত্ত্বিক সংগ্রহগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা। এই সবকিছুই প্রথমে লন্ডনে সংরক্ষিত ছিল। মেই যখন এ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তখন লন্ডনে গিয়ে মিলসের সব সংগ্রহ পর্যবেক্ষণ করে সেগুলোর একটি কপি তৈরি করেন। এর কয়েক বছর পর আবার লন্ডনে গিয়ে দেখেন কোন এক অদ্ভূত কারণে অনেকগুলো সংগ্রহই হারিয়ে গেছে। এই শঙ্কা থেকেই তিনি পরবর্তীতে মিলসের সকল রচনা এবং ছবি একসাথে করে একটি বই রচনার কাজে হাত দেন। সেই গবেষণাধর্মী বইয়ের প্রকাশনা বিষয়েই তিনি কথা বলেছেন এই কর্মশালায়। ৪২১ পৃষ্ঠার বইটি প্রিন্ট আকারে প্রকাশিত হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। কিন্তু কর্মশালা শেষে ভোলফগাং এর সাথে কথা বলে জানলাম হাইডেলবার্গের ওয়েবসাইটে এর সফট কপি বিনামূল্যেই দেয়া আছে। যে কেউ চাইলে এই লিংক থেকে বইটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন।

বাসায় ফিরে ডাউনলোড করে আসলেই অবাক। ফিলিপ মিলস বেশ আন্তরিকতার সাথেই ১৯২০ এর দশকে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করেছিলেন, সে সময়কার তিন জন নেতার (চিফ) সচিত্র জীবনী লিখেছিলেন। আদিবাসীদের ব্যবহৃত অনেক বস্তু সংগ্রহ করেছিলেন। বইয়ের কিছু অংশ এখানে অনুবাদের চেষ্টা করছি:

ফিলিপ মিলস ১৮৯০ সালে ইংল্যান্ডের চেশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা গ্রহণ করেন উইনচেস্টার কলেজ এবং অক্সফোর্ডের কর্পাস ক্রিস্টি কলেজে। ১৯১৩ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে আসামের নাগা পর্বতের মোককচুং এ চলে আসেন যখন তার বয়স মাত্র ২৬ বছর। সেখানে কয়েক বছর সাব-ডিভিশনাল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৩৩ সালে কোহিমার ডেপুটি কমিশনার এবং ১৯৪৩ সালে সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী অঞ্চলের গভর্নর মনোনীত হন। ১৯৪৭ এ ভারতের স্বাধীনতার পর ৫৭ বছর বয়সী মিলসের শারীরিক অবস্থা বিশেষ ভাল ছিল না। আইসিএস থেকে অবসর গ্রহণ করে লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিস এ প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে অসুস্থতার জন্য সেখান থেকেও অবসর গ্রহণ করেন, মারা যান ১৯৬০ সালে।

বিংশ শতকের প্রথম দশকে চট্টগ্রামের প্রশাসনিক অবস্থা একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। চিফদের অব্যবস্থা দেখে সরকার বাধ্য হয়ে ১৯২৫ সালে তাদের হাত থেকে চাষী জমির খাজনা আদায়ের ক্ষমতা কেড়ে নেয়। উপনিবেশ বিষয়ক গবেষণায় এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। জে পি মিলসের চট্টগ্রাম গমনের উদ্দেশ্য ছিল চিফদের সাথে ইংরেজ প্রশাসনের সমঝোতা প্রতিষ্ঠা। ভবিষ্যৎ প্রশাসনে চিফদের ভূমিকা নির্ধারণের জন্য মিলস তাদের ইতিহাস, মর্যাদা, অধিকার এবং দায়িত্ব নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন। তাদের কাজ যেহেতু তাদের পূর্বতন মর্যাদা এবং ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে সেহেতু মিলসই প্রথম এই পার্বত্য এলাকার সমাজগুলোর বিশেষ গোষ্ঠীগত ভিত্তি আবিষ্কার করেন। এসব আবিষ্কারের প্রেক্ষিতে তিনি বাংলার সরকারকে এমন কিছু নীতিমালা প্রণয়নের পরামর্শ দেন যার মাধ্যমে চিফদেরকে তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে পার্বত্য প্রশাসনে একটি বিশেষ পদাধিকার দেয়া যাবে এবং একইসাথে ইংরেজ প্রশাসনের স্বার্থ অনুযায়ী জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। পার্বত্য এলাকায় ২ মাস, চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রকাশনার খোঁজ খবর নেয়া এবং নাগা পর্বতের অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি এসব পরামর্শ দিয়েছিলেন।

মিলসের রচনা প্রথমে সংরক্ষিত ছিল স্কুল অফ আফ্রিকান অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিস এবং অক্সফোর্ডের স্কুল অফ অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড মিউজিয়াম অফ এখনোগ্রাফিতে। প্রথম স্কুলের পাণ্ডুলিপিকে ভোলফগাং মেই “লন্ডন পাণ্ডুলিপি” এবং দ্বিতীয় উৎসের গুলোকে “অক্সফোর্ড পাণ্ডুলিপি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কি কি আছে এসব পাণ্ডুলিপিতে তাই দেখে নেয়া যাক:

লন্ডন পাণ্ডুলিপি:
# হাতে লেখা “Diary of a Tour”, চট্টগ্রামে ১৯২৬ সালের ১৮ই নভেম্বর থেকে ১৯২৭ সালের ১৩ই জানুয়ারি পর্যন্ত ভ্রমণের কাহিনী
# টাইপ করা “Report on the Chiefs of the Chittagong Hill Tracts”
# টাইপ করা “Proposal regarding the Chiefs” এবং একটি “Subtenant’s Lease” (উপপ্রজাস্বত্ত্বের ইজারা) এর অনুবাদ।
# Suggested Agricultural Experiments
# Specific Duties for Chiefs
# Compulsory Labour
# Specific Duties of Chiefs
# Chakma Chief’s History
# Education
# Four word lists (Khyeng, Marma, Tippera-Mro, Mro-Khyeng)
# ১০১টি ছবি

অক্সফোর্ড পাণ্ডুলিপি:
# History of the Chittagong Hill Tracts
# Proposals regarding the Chiefs
# Translation of a Subtenant’s Lease of the Chakma Chief
# Suggested Agricultural Experiments
# Compulsory Labour
# The Collection of the Jhum Tax
# History of the family of the Bohmong

এই ১০১টি ছবির মধ্যে কিছু তুলে ধরছি:

মা এবং শিশু, জে পি মিলস, উন্দ্রিমাছড়ি থেকে

একজন ম্রো হেডম্যান ও তার স্ত্রী। (জে পি মিলস)

১৯২৬ সালের রাঙামাটি

জে পি মিলসের ডায়রিটি পড়তে শুরু করে দ্বিতীয় দিনের লেখাতেই বেশ উৎসাহ পেলাম। ১৯২৬ সালের ১৯শে নভেম্বর তার ডায়রিতে লেখা:
রাঙামাটি: চাকমা চিফ+দেওয়ান আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। চিফ আসামের চিফদের কি কি সুবিধা দেয়া হয় তাই নিয়ে জেরা করতে শুরু করল। তার পোশাক বাঙালিদের মত আর মাথায় সুবিধা আদায়ের চিন্তা। সে আমাকে তার বাবার অর্জিত স্বর্ণের ঘড়ি দেখাল, তার বাবাকে আমি যদ্দূর মনে করি রাজা নয় বরং রায় বাহাদুর ডাকা হতো। আমি তাকে জুম চাষে উন্নতির কথা বলতে চাইলে সে এক বিন্দু উৎসাহও দেখাল না। চাকমাদের নির্বিচারে বাঙালিত্ব গ্রহণের বিরোধিতা করলে সে বলল, বাঙালি সংস্কৃতি চাকমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। আমি বোঝাতে চাইলাম, বাঙালি সংস্কৃতিতে একজন চাকমা চিফের কোন স্থান থাকবে না, কিন্তু মনে হল তার জীবদ্দশায় সে চিফ থাকতে পারলেই খুশী, এরপর কি হবে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

জলবায়ু, বাণিজ্য ও আমলাতন্ত্র: উত্তর-পূর্ব বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের পত্তন
- গুনেল চেডেরলফ

গুনেল নাকি এই নামে একটি বই লিখছেন। কর্মশালায় বইটিই পরিচয় করিয়ে দিলেন সবার কাছে। ভূমিকা থেকে কিছু অংশ পড়লেন, বুঝিয়ে দিলেন বইটির সারবত্তা। তার বর্ণনার সুবিধার্থে বাংলাদেশের সীমান্ত ভুলে যাওয়া দরকার ছিল। কারণ উনবিংশ শতকে সিলেটকে কেন্দ্র করে আসাম ও মেঘালয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিস্তৃতির সময় নিশ্চয়ি কেউ ভাবতে পারেনি বাংলাদেশ নামে একটি আলাদা দেশের জন্ম হবে। তার প্রথম যে কথাটি মন কাড়ল তা মানচিত্র বিষয়ে। উনবিংশ শতকে রাণীর আদেশে ইংরেজ ভূতাত্ত্বিকদের করা একটি মানচিত্র দেখিয়ে বললেন, মনে রাখতে হবে বাস্তবে কি আছে সেটি মানচিত্র নয় বরং বাস্তবতাকে শাসনকর্তারা কিভাবে দেখতে চান মানচিত্রে তাই ফুটে উঠে।

সত্যিই তাই। ব্রিটিশদের মানচিত্রগুলো নাকি অবিচ্ছিন্ন ছিল না। যে অঞ্চলে তারা প্রভাব বিস্তার করতে চাইতো সেগুলো স্পষ্ট দেখানো থাকতো আর থাকতো সেখানে পৌঁছানোর উপায়। মানচিত্র যেন ছিল এক ধরণের দিক নির্দেশনা। গুনেল এমন একটি মানচিত্র দেখালেন যা পশ্চিমে কলকাতা থেকে শুরু করে পূর্বে একেবারে মেঘালয় পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া সীমান্তে গিয়ে ঠেকেছে, উত্তরে হিমালয়-তিব্বত থেকে শুরু করে দক্ষিণে দেখা যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ছিল, মানচিত্রের একেবারে কেন্দ্রে মেঘালয়। রাজ্য হিসেবে মেঘালয়ের গুরুত্ব ইংরেজদের কাছে কতোটা ছিল তা মানচিত্র দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

আসাম এবং মেঘালয়ে ঔপনিবেশিক প্রভাব বিস্তারে সিলেটের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। সিলেট তখন ছিল বেশ আন্তর্জাতিব শহর, ইংরেজ নয় বরং আরমেনিয়া এবং অন্যান্য অনেক দেশের বণিকরা তখন এখানে ব্যবসা খুলে বসেছিল। আনাগোণা ছিল অনেকের, কারণ চৈনিক সিল্ক রোডে পৌঁছানোর জন্য এই শহর চিড়ে বয়ে গিয়েছিল আরেকটি সড়ক যাকে সেখানে সিল্ক রোড নামেই ডাকা হতো। ঔপনিবেশিত বাণিজ্যের রূপরেখা তার বইয়ে ফুটে উঠবে বলেই মনে হলে। বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হবে বললেন তিনি।

“ওরা আমাদের জমি কেড়ে নিচ্ছে”
- এলেন বল ও এফা গেয়াহারৎস

এই আলোচনাটুকুই আমাকে সবচেয়ে বেশি আচ্ছন্ন করল। পরিচয় দেখেই বুঝলাম এলেন বাংলাদেশে অনেকদিন ছিলেন, এমনকি তিনি পিএইচডি গবেষণা করেছেন ময়মনসিংহে। এফা বাংলাদেশ নিয়ে নতুনভাবে গবেষণা শুরু করছেন ২০১০ সালে রাঙামাটিতে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনার পর। তাদের বক্তব্যের বিষয় ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী অঞ্চলে আদিবাসী-বাঙালি সম্পর্ক নিয়ে একটি নতুন গবেষণার সূত্রপাত। তারা দুজনেই গবেষণার প্রস্তাব তৈরি করছেন এই মুহূর্তে। তবে তাদের গবেষণা হবে তুলনামূলক যেহেতু নৃবিজ্ঞান আবশ্যিকভাবেই একটি তুলনামূলক বিজ্ঞান।

তুলনা হিসেবে তারা বেছে নিয়েছেন ভারতের মেঘালয় এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে। এই দুটি অঞ্চলই ব্রিটিশ শাসনামলে পৃথক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত ছিল যেখানে আদিবাসীদের জন্য ব্রিটিশ আইনে বিশেষ অধিকার দেয়া ছিল। ১৯৪৭ এর পর দুই অঞ্চলের অবস্থানই কিছুটা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। ভারতের মেঘালয়ে যেমন সাধারণ ভারতীয়দের আনাগোণা শুরু হয় তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের আনাগোণা শুরু হয়। মেঘালয়ের অবস্থাও খুব ভাল নয়, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের তুলনায় অনেক ভাল। কারণ সেখানে মেঘালয়কে একটি পৃথক অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছিল ৪৭-এর পরেও। কিন্তু বাংলায় পাকিস্তান সরকার পৃথক আদিবাসী অঞ্চলের ধারণা লুপ্ত করে আদিবাসীধেরকে উপজাতি বা পাকিস্তানের মধ্যকার বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দিতে থাকে। সুতরাং পৃথক অঞ্চলের আদিবাসী হিসেবে তাদের অধিকাংশ অধিকারই লোপ পায়।

রাঙামাটিতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণও তাদের বক্তব্যে উঠে আসে। তারপর চলে এভাবে- ১৯৭১ এ স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পর আদিবাসীদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। স্বাধীন দেশ হয় শুধু বাঙালিদের দেশ। এই দেশটির ভেতরে এতো-শত বৈচিত্র থাকলেও দেশের সংবিধান বা বাইরে থেকে দেখলে বোঝার কোন উপায় নেই। বাইরে থেকে মনে হয় এ বুঝি কেবলই বাঙালিতে বাঙালিময়। যাহোক এরপরে আবার শুরু হয় নতুন যন্ত্রণা- নতুন সরকারগুলো পরিকল্পিতভাবে সমতলের বাঙালিদেরকে ব্যাপক হারে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত করে। শুরু হয় সেটলার-পাহাড়ী সংঘর্ষের যুগ। পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধ চলে অনেকদিন ধরে যার প্রহসনমূলক সমাপ্তি ঘটানো হয় ১৯৯৭ সালে একটি ছদ্ম শান্তি চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তির শর্তগুলো আজও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি।

আলোচনায় উঠে আসে ২০১০ সালে রাঙামাটিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা। আসলে এলেন এবং এফা তাদের গবেষণা শুরুর তাড়া অনুভব করছেন এই অগ্নিকাণ্ডের পরই। এতোদিন কেবল বাংলাদেশে আদিবাসীদের নিয়ে কথা হয়েছে, কিন্তু তিনি তাদের গবেষণায় সেটলারদের প্রেক্ষাপটও তুলে আনতে চাইছেন। তারা বাংলাদেশ থেকে দুই জন পিএইচডি শিক্ষার্থী নিয়োগ করবেন। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার নাকি এখন পার্বত্য এলাকার গহীনে বিদেশীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলেই যদি আদিবাসীদের অবস্থা এত খারাপ হয় তাহলে ভবিষ্যতে কখনো বিএনপি (যাকে জামাতের শাখা নামে ব্যঙ্গ করারও চল শুরু হয়েছে) ক্ষমতায় এলে অবস্থা কি হবে তা ভাবলেই গা শিউরে উঠে। তবে বলা যায় না, হয়তো আদিবাসী প্রশ্নে সবাই এক রকম।

কর্মশালায় বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রতি মনোভাবের সমালোচনা যেমন হল তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের নিয়ে অনেক হাসাহাসিও হল। যেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রী দিপু মণি নাকি সম্প্রতি জাতিসংঘের এক সভায় বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। সেই পুরাতন ধারণা, যে বাঙালিরাই বাংলাদেশের আদিবাসী এবং প্রকৃত আদিবাসীরা বার্মা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে আগত- সেই ধারণাকেই আবার উস্কে দিতে চাইছে লীগ। এর পেছনে অবশ্য রাজনৈতিক কারণও বোঝা যায়। হয়তো যে কোন উপায়ে সামরিক বাহিনীকে হাতে রাখতেই লীগ মরিয়া হয়ে আদিবাসী অধিকার হননের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া না হলে জাতিসংঘের বেশ কিছু আদিবাসী সংক্রান্ত চুক্তিপত্রে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর করতে হবে না যা নাকি সেনাবাহিনীর জন্য ভাল। কারণ বাংলাদেশে সেনাবাহিনী আদিবাসীদের উপর নির্যাতন করছে এই খবর বিদেশে আরও প্রচারিত হলে হয়ত শান্তি মিশনের নামে সেনাবাহিনীর মহাবাণিজ্য মহা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রথমে আদিবাসীদেরকে বাঙালিরা ডাকা শুরু করে উপজাতি। এমনকি বাংলাপিডিয়াতেও উপজাতি সম্বোধন রয়েছে, আছে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো নিয়ে পক্ষপাতমূলক সব তথ্য। এখন নাকি আবার সব মূলধারার পত্রিকায় আদিবাসী শব্দটি এড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে “ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী”। এলেনরা তাদের বক্তৃতার সময় tiny minority, small community, tiny tribe বা এমন কিছু বোঝাতে চাইছিলেন কিন্তু বাংলাটা বলতে পারছিলেন না, আমি ধরিয়ে দিলাম ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী শব্দদ্বয়, সেই সুযোগে এলেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা গেল, বক্তৃতা শেষে বিস্তারিত কথা হল তার সাথে।

এলেনের সাথে যতোই কথা বলতে লাগলাম বিস্ময়ের সীমা ততোই সম্প্রসারিত হতে থাকল। প্রথমে যখন শুনল যে আমি ময়মনসিংহের তখন তার প্রশ্ন ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজের কোন দিকে আমার বাড়ি। আমি তো হতবাক, পরে শুনলাম এলেন তার পিএইচডি করেছেন ময়মনসিংহের গারোদের নিয়ে। অনেকদিন ছিলেন সেখানে। বাংলা কিছুটা বলতে পারেন, কিছুদিন কিছুদিন পরপরই বাংলাদেশে যান। আসছে ফেব্রুয়ারিতেও যাবেন একবার। ঘরে ফিরে প্রথম কাজ ছিল তার প্রোফাইল ঘাটা। ইউনিভার্সিটি অফ আমস্টারডামের ওয়েবসাইটে পেলাম। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগল তার পিএইচডি গবেষণা দিয়ে প্রকাশিত বইটির নাম: They Ask If We Eat Frogs: Garo Ethnicity in Bangladesh. বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি সাধারণের যে মনোভাব তা এই একটি বাক্যেই কিন্তু খুব সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়।

About Khan Muhammad

A man's heart has heard two ways through life- the way of nature and the way of grace. You have to choose which one you'll follow. Grace doesn't try to please itself. It accepts being slighted, forgotten, disliked. It accepts insults and injuries. Nature only wants to please itself, get others to please it too. It likes to lord it over them; to have its own way. It finds reasons to be unhappy when all the world is shining around it and love is smiling through all things. They taught us, that no one who loves the way of grace, ever comes to a bad end.
This entry was posted in নৃবিজ্ঞান and tagged , , , , . Bookmark the permalink.

8 Responses to নিষ্পাদনী পরিচয়

  1. swakkhar says:

    “চাকমাদের নির্বিচারে বাঙালিত্ব গ্রহণের বিরোধিতা করলে সে বলল, বাঙালি সংস্কৃতি চাকমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। আমি বোঝাতে চাইলাম, বাঙালি সংস্কৃতিতে একজন চাকমা চিফের কোন স্থান থাকবে না, কিন্তু মনে হল তার জীবদ্দশায় সে চিফ থাকতে পারলেই খুশী, এরপর কি হবে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না” — can you please check whether the translation is ok here??? thanks

  2. swakkhar says:

    sorry, my mistake, you were correct :)

    checked from the original version by myself :)
    thanks !!

    • হ্যা আমিও আসলে এটুকু পড়ে অবাক হয়েছিলাম। এখানে আমার মনে হয় যেটা ফুটে উঠেছে- সে সময়কার হেডম্যানদের নির্বিকার ভাব এবং বাঙালিত্ব গ্রহণ। জে পি মিলস ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন এবং বিরোধিতা করেছেন বলেই মনে হচ্ছে এখানে।

  3. achintya says:

    I read the article. Thnx to writer to work about CHT.

  4. mahan chandra says:

    this article is a real history of CHT. it proves that chakma,marma,tripura and others 10 ethnecity locals are main Adivashi not bangalee.

  5. Nipun chakma says:

    Thank you for ur informative writing and for the link specially.

  6. অসাধারণ লেখা। তথ্যমূলক এই বিবরণী থেকে অনেক অজানা কিছু জানলাম। চট্টগ্রামে আদিবাসীদের যে মনোভাব, তাকে আমি সম্মান জানাই, শ্রদ্ধা করি। আমরা বাঙালিরাই সেখানে আগ্রাসন চালাচ্ছি- আমি এটাই বিশ্বাস করি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s