অপর পৃথিবী: তারার চারপাশে গ্রহ না থাকাটাই অস্বাভাবিক

আজ থেকে ২০ বছর আগেও আমরা জানতাম না যে সূর্য ছাড়া আর কোন তারার গ্রহ রয়েছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তথাকথিত বহির্জাগতিক গ্রহ বা বহির্গ্রহ আবিষ্কৃত হতে শুরু করে। সম্প্রতি কেপলার পৃথিবীর সমান বা তার চেয়ে কিছুটা বড় গ্রহও আবিষ্কার করতে পারছে। আজকের হিসাব অনুযায়ী: আবিষ্কৃত মোট বহির্গ্রহের সংখ্যা ৭২৩। গ্রহ আবিষ্কারের সবচেয়ে কার্যকর এবং তথাপি জনপ্রিয় পদ্ধতি দুটি হচ্ছে অরীয় বেগ এবং ট্রানজিট। যেমন, এযাবৎ আবিষ্কৃত গ্রহগুলোর ৬৬৪ টিই আবিষ্কার করা হয়েছে এই দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে, এর মধ্যে ২০০টি ট্রানজিট এবং বাকিগুলো অরীয় বেগ পরিমাপের মাধ্যমে। এই আবিষ্কারগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত টেনেছিলেন আকাশগঙ্গার শতকরা ১৭-৩০ ভাগ তারার চারপাশে কোন না কোন গ্রহ রয়েছে।

কিন্তু এই ১১ই জানুয়ারি বেরিয়ে এল একবিংশ শতকের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিজ্ঞান সংবাদ: আমাদের এই আকাশগঙ্গায় যত তারা আছে তারচেয়ে গ্রহের সংখ্যা বেশি। আরও সঠিকভাবে বললে, তারাপ্রতি গ্রহের সংখ্যা ১.৬। কিছু তারার হয়ত কোন গ্রহ নেই, আবার কিছু তারার আছে একাধিক, যেমন আমাদের সূর্যের আছে ৮টি। এটি আবিষ্কার করেছে ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির একদল জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী যাদের নেতৃত্বে ছিলেন আর্নো কাসাঁ, ডানিয়েল কুবাস এবং রিচার্ড হুক। তারা গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেছেন বিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল নেচারে (এখান থেকে পিডিএফ ডাউনলোড করা যাবে)।

বাংলাদেশের মত পুরো ইউরোপই পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। সেই অষ্টাদশ শতকে যখন ইউরোপে আকাশ পর্যবেক্ষণবিদ্যার উন্নতি শুরু হয় তখনই জ্যোতির্বিদরা একটি সমস্যা টের পাচ্ছিলেন। তা হচ্ছে দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে পর্যবেক্ষণের অভাব। দক্ষিণ গোলার্ধে দুরবিন স্থাপন করে বহিশ্ছায়াপথীয় পর্যবেক্ষণ প্রথম শুরু করেছিলেন উইলিয়াম হার্শেলের ছেলে জন হার্শেল। তাদের ঐতিহ্যের সূত্র ধরেই একসময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO বা ইসো) যাদের মূল পর্যবেক্ষণ শিবির দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে। চিলির আতাকামা মরুভূমি জ্যোতির্বিদদের হটস্পট। কারণ এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যেমন উঁচু, তেমনি শুষ্ক, যে কারণে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও প্রবাহ পর্যবেক্ষণে খুব কম ব্যাঘাত ঘটায়। আসলে এই মরুভূমি প্রমাণ করেছে উত্তর নয়, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের জন্য দক্ষিণ গোলার্ধই সবচেয়ে উপযোগী।

অদূরে চেরো পারানাল পাহাড়ের চূড়ায় ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ খ্যাত চারটি দুরবিন দৃশ্যমান, নিচে পর্যবেক্ষণ শিবির

তো ইসো তাদের ৬ বছরের গ্রহ জরিপের ফলাফল একসাথে করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। আর জরিপটি চালানো হয়েছে মহাকর্ষীয় অণুলেন্সিং (gravitational microlensing) পদ্ধতিতে। প্রশ্ন হচ্ছে তথাকথিত সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি অরীয় বেগ বা ট্রানজিট কেন ব্যবহার করা হল না। হয়নি কারণ, ঐ দুই পদ্ধতিতে এমন গ্রহগুলোই শুধু পাওয়া যায় যারা তাদের মাতৃতারার খুব নিকটে আছে। সুতরাং আগে যে বলা হয়েছিল ১৭-৩০% তারার চারদিকে গ্রহ আছে তা সংশোধন করে বলা উচিত, শতকরা ১৭-৩০ ভাগ তারার কাছাকাছি অঞ্চলে গ্রহ রয়েছে। কিন্তু অণুলেন্সিং এর মাধ্যমে ০.৫ থেকে ১০ নভো একক দূরত্বের মধ্যে সকল গ্রহ সনাক্ত করা যায়। উল্লেখ্য পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্বকে বলে ১ নভো একক। অণুলেন্সিং পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে তাই দেখে নেয়া যাক প্রথমে।

আইনস্টাইনের মহাকর্ষ সূত্র বলে ভারী বস্তু তার আশেপাশে স্থানকাল বাঁকিয়ে দেয়। আলো স্থানকালের মধ্য দিয়েই চলে। তাই স্থানকাল বেঁকে গেলে আলোর গতিপথও যাবে বেঁকে। এর মাধ্যমেই জন্ম হয় লেন্সিং প্রক্রিয়ার। তারা এবং গ্রহ যেহেতু অনেক ভারি সেহেতু তারাও স্থানকাল বাঁকাতে সক্ষম, অবশ্যই গ্রহের তুলনায় তারাসৃষ্ট বক্রতা অনেক বেশি হবে কারণ তারার ভর গ্রহের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। তো ধরুন আমরা অনেক দূরের একটি তারা দেখছি, এখন আমাদের দৃষ্টিসীমার মাঝে যদি অন্য একটি তারা এসে পড়ে তাহলে পটভূমি তারার আলো পুরোভূমির তারার কারণে বেঁকে যাবে। এ কারণে পটভূমি তারার উজ্জ্বলতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়, আর যদি পুরোভূমি তারার চারদিকে আইনস্টাইন বলয়ের কাছাকাছি কোন গ্রহ থাকে তাহলে উজ্জ্বলতা কিছু সময়ের জন্য আরও বেড়ে যায়। নিচের ছবি দুটো আশাকরি অণুলেন্সিং বোঝার জন্য যথেষ্ট হবে:

অণুলেন্সিং খুবই বিরল ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতি ১০ লক্ষ তারার মধ্যে মাত্র একটি এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রতি রাতে লক্ষ লক্ষ তারা একসাথে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন আলোকবক্রে কোন হেরফের ঘটে কিনা দেখার জন্য। সময়ের সাথে কোন তারার উজ্জ্বলতার হ্রাসবৃদ্ধি দেখানোর জন্য যে লেখচিত্র আঁকা হয় তারই নাম আলোকবক্র। যে তারাগুলোর আলোকবক্রে অণুলেন্সিং এর ছাপ পাওয়া যায় সেগুলো চিহ্নিত করে রাখা হয়। এমনই একটি জরিপ হচ্ছে ওগলে বা অপটিক্যাল গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এক্সপেরিমেন্ট। এই পরীক্ষায় অনুলেন্সিং এর মাধ্যমে পাওয়া গ্রহপ্রার্থীগুলো আরেকটি গবেষক দলকে জানানো হয় যার নাম প্ল্যানেট বা প্রোবিং লেন্সিং অ্যানোম্যালিস নেটওয়ার্ক। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলো দুরবিনের মাধ্যমে অনুলেন্সিং প্রার্থীগুলোকে নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন প্ল্যানেট দলের বিজ্ঞানীরা। আজকে যে খবর নিয়ে লিখছি তা ওগলে-প্ল্যানেট যোগসাজোশেরই অবদান।

প্রশ্ন হচ্ছে, মাত্র কয়েকটি গ্রহ আবিষ্কার করেই বিজ্ঞানীরা কিভাবে বলে দিলেন যে সকল তারার গ্রহ আছে? এর জন্য প্রথমেই তারা ওগলে-প্ল্যানেট এর গ্রহ সনাক্ত করার দক্ষতা নির্ণয় করেছেন। যদি পর্যবেক্ষণকৃত প্রতিটি তারার চারপাশে একটি করে গ্রহ থাকে তাহলে কতগুলো অণুলেন্সিং ধরা পড়বে সেটাই হিসাব করা হল প্রথমে। এই রাশিটির একটি গালভরা নাম দেয়া যেতে পারে নিরূপণ ক্ষমতা (detection efficiency)। তো ২০০২ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ওগলে এবং প্ল্যানেট মিলে যতগুলো তারা পর্যবেক্ষণ করেছে তার সবগুলোরই যদি গ্রহ থাকে তাহলে আবিষ্কৃত গ্রহের সংখ্যা কত হওয়ার কথা সেটা খুব সহজেই বের করে ফেলা সম্ভব। এখন বাস্তবে যদি দেখা যায়, ঠিক ততোগুলো গ্রহই আবিষ্কৃত হয়েছে তাহলে নিচের দুটি সিদ্ধান্তের যে কোনটি টানা যায়:

১। আমরা ভয়ানক রকমের সৌভাগ্যবান।
২। আসলেই প্রতিটি তারার চারপাশে গ্রহ আছে।

স্বজ্ঞা বলে আমাদের সৌভাগ্যের ইতিহাস বিশেষ সুবিধের নয়। পরিসংখ্যান সবসময় আমাদেরকে সৌভাগ্য থেকে বাস্তবতার দিকে নিয়ে আসতে সাহায্য করে। পৃথিবীর সব কাকতালকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাখ্যার নামই যদি হয় পরিসংখ্যান তাহলে বলতেই হবে বিজ্ঞানের মতে আকাশগঙ্গার প্রতিটি তারার চারপাশেই গড়ে একের অধিক গ্রহ আছে। এমনকি তারা এই পরিসাংখ্যিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন ভরের গ্রহের সংখ্যা কেমন হওয়া উচিত তাও হিসাব করেছেন। দেখা গেছে গ্রহের ভর যত বাড়ে সংখ্যা তত কমে, অন্য কথায়, ভারী গ্রহের তুলনায় হালকা গ্রহের সংখ্যা বেশি। সেটা সত্য হলে পৃথিবীর মত গ্রহের সংখ্যাও প্রচুর হওয়ার কথা। কোন তারার ০.৫ থেকে ১০ নভো-একক দূরত্বের মধ্যে কোন গ্রহের সংখ্যা কেমন তার সারাংশ নিচের সংখ্যাগুলো দিয়ে প্রকাশ করা যায়:

১। ১৭% তারার বৃহস্পতি-সদৃশ (০.৩ থেকে ১০ বৃহস্পতি ভরের) গ্রহ আছে
২। ৫২% তারার নেপচুন-সদৃশ (১০ থেকে ৫০ পার্থিব ভরের) গ্রহ আছে
৩। গড়ে প্রতিটি তারার চারপাশে ১.৬ টি করে গ্রহ আছে। এখানে কেবল পৃথিবীর ভরের ৫ গুণ থেকে বৃহস্পতির ভরের ১০ গুণ ভারী গ্রহদের কথা বলা হচ্ছে।

আমাদের ছায়াপথে মোট তারার সংখ্যা প্রায় ৩০,০০০ কোটি। সে হিসেবে গ্রহের সংখ্যা ৪৮,০০০ কোটি। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি গ্রহের কতগুলো প্রাণ বিকাশের উপযোগী হতে পারে এবং প্রাণ ধারণে সক্ষম গ্রহগুলোর মধ্যে কতগুলোতে বুদ্ধিমান প্রাণের বিকাশ ঘটতে পারে তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। কোথায় যেন পড়েছিলাম কোন সভ্যতার পতনের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে একঘেয়েমি। সেদিক থেকে বলা যায় আর যাই হোক অন্তত একঘেয়েমির জন্য আধুনিক মানব সভ্যতার পতন ঘটবে না। আমাদের একঘেয়েমি দূর করতে প্রতি দশকেই বেরিয়ে আসবে এমন সব শ্বাসরুদ্ধকর খবর।

About Khan Muhammad

A man's heart has heard two ways through life- the way of nature and the way of grace. You have to choose which one you'll follow. Grace doesn't try to please itself. It accepts being slighted, forgotten, disliked. It accepts insults and injuries. Nature only wants to please itself, get others to please it too. It likes to lord it over them; to have its own way. It finds reasons to be unhappy when all the world is shining around it and love is smiling through all things. They taught us, that no one who loves the way of grace, ever comes to a bad end.
This entry was posted in গ্রহবিজ্ঞান. Bookmark the permalink.

2 Responses to অপর পৃথিবী: তারার চারপাশে গ্রহ না থাকাটাই অস্বাভাবিক

  1. সাধু! সাধু!
    অট: রেডিও টেলিস্কোপ প্রোজেক্ট কতদূর?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s