বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ দুটো বইয়ের নাম বলতে বলা হলে অবশ্যই উঠে আসবে আইজ্যাক নিউটনের “Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica” এবং চার্লস ডারউইনের “On the Origin of Species by Means of Natural Selection, or the Preservation of Favoured Races in the Struggle for Life”. দ্বিতীয় বইটার বাংলা অনুবাদ হলেও প্রথমোক্ত বইটির কোন বঙ্গানুবাদ হয়নি। সম্ভবত নিউটনের বইয়ে গণিতের অধিক ব্যবহার আছে বলেই বঙ্গানুবাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি কেউ। কিংবা হয়ত আধুনিক পাঠ্য পুস্তকে নিউটনের গতিবিদ্যার চুলচেরা বিশ্লেষণ থাকে বলে আসল বইটি পড়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না কেউ। অবশ্য এমনও হতে পারে, অনুবাদ হয়েছে কিন্তু আমি জানি না। বাস্তবতা যাই হোক না কেন অনুবাদ কর্মে হাত দিতে তো কোন বাঁধা নেই। তাই আমি আজ থেকে অনেক বছর আগে শুরু করেছিলাম অনুবাদ।
সত্যিই একেবারে এগুনো হয়নি। কেবল কয়েকটি সংজ্ঞা অনুবাদ করেই ক্ষান্ত হয়েছিলাম। হয়ত পরীক্ষার ব্যস্ততা ছিল বলে। তবে আর যাই হোক মৃত্যুর আগে এই বইয়ের একটা বঙ্গানুবাদ করে যাব প্রতিজ্ঞা করেছি। অনেক কিছুই মানুষ জমিয়ে রাখে, এবং সত্যি কথা হচ্ছে প্রতিটি মানুষের মৃত্যু যে কেবল তার দেহের মৃত্যু তাই নয়, তার সাথে অসংখ্য জমিয়ে রাখা কাজ আর স্বপ্নের মৃত্যু। যাহোক আমি যেটুকু অনুবাদ করেছিলাম তা ব্লগে তুলে রাখার চিন্তা করলাম। বাংলা উইকিসংকলনে অনুবাদ শুরু করেছিলাম। সুতরাং সেখানে অধ্যায় অনুযায়ী সবই সাজানো আছে।
প্রথম সংস্করণে নিউটনের ভূমিকা
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ প্রাকৃতিক বিষয়াদির অনুসন্ধানে বলবিদ্যার গুরুত্ব সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণে করে এসেছে। অপরদিকে, আধুনিক মানুষেরা মূর্তিমান অবয়ব ও গুপ্ত গুণসমূহ পরিত্যাগ করে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে গাণিতিক নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। এহেন পরিস্থিতিতে আমি গণিতকে ততোটাই ব্যবহার করেছি যতোটা করলে দর্শনের সাথে সাথে তার সামঞ্জস্য বিধান করা যায়। প্রাচীন মানুষেরা বলবিদ্যাকে দুটি প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতো যেদুটি পয়সার এটিঠ ওপিঠের মত।একটি যৌক্তিক প্রেক্ষাপট, অন্যটি ব্যবহারিক। যৌক্তিকটি সম্পূর্ণই প্রদর্শন নির্ভর, যেখানে ব্যবহারিকটির মধ্যে পড়ে সব ধরণের ম্যানুয়াল শিল্প কৌশল। আসলে মেকানিক্স শব্দটিই (বলবিদ্যার ইংরেজি প্রতিশব্দ) ব্যবহারিক বলবিদ্যাকে নির্দেশ করে। কারিগর সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারেনা বলেই বলবিদ্যার সাথে জ্যামিতির পার্থক্য সূচিত হয়েছে। সম্পূর্ণ নির্ভুলটিকেই জ্যামিতি বলা হয়, আর যতো কম নির্ভুল ততোটাই তা বলবিদ্যা। তবে মনে রাখতে হবে, শিল্প কৌশল সম্পূর্ণ নির্ভুল, ত্রুটি যা তা কারিগরের। যার নির্ভুলতা যত কম সে তোটাই অদক্ষ, আর কেউ যদি সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারে তবে সে সবচাইতে দক্ষ। কারণ যে সরলরেখা ও বৃত্তের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে জ্যামিতি গঠিত হয়েছে বলবিদ্যাই তার মালিক।
….. আর করা হয়নি
সংজ্ঞাসমূহ
সংজ্ঞা ১
বস্তুর পরিমাণ (quantity) হল উক্ত বস্তুটিরই পরিমাপের (measure) ফল, যা তার ঘনত্ব এ আকার-আয়তন (bulk) উভয়ের সম্মিলনে উৎপত্তি লাভ করে।
সুতরাং, বায়ুর ঘনত্ব ও আয়তন উভয়ই দ্বিগুণ করে দেয়া হলে তার পরিমাণ চার গুণ হবে, আর ঘনত্ব দ্বিগুণ ও আয়তন তিনগুণ করা হলে পরিমাণ হবে ছয় গুণ। ঠিক একইভাবে বরফ ও বিশুদ্ধ ধূলিকণা বা পাউডারসহ এধরণের যেকোন বস্তু যা ঘনীভূত, সংকুচিত বা তরলীকৃত বা অন্য কোন ভাবে ঘনীভবনের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়, তাদের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য। আমি এখানে কোন মাধ্যমে উল্লেখ করিনি, যদি তা সত্যিই থেকে থাকে তবে বলতে হয়, তা বস্তুর অংশসমূহের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে মুক্তভাবে অনুপ্রবেশ করে থাকে। আমি যেখানেই বস্তু বা ভরের নাম দিয়ে কোন পরিমাণের কথা উল্লেখ করেছি তা দ্বারা এই পরিমাণকেই বুঝিয়েছি। বস্তুর ওজন দ্বারাও একই পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে, কারণ পরিমাণ ওজনেরই সমানুপাতিক যা আমার পেন্ডুলাম পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। খুব নিখুঁতভাবে করা এই পরীক্ষাটি সম্বন্ধে পরে আলোচনা করা হবে।
সংজ্ঞা ২
গতির পরিমাণ হল উক্ত গতিরই পরিমাপের ফল, যা তার এবং গতিশীল বস্তুর পরিমাণ, উভয়ের সম্মিলনে উৎপত্তি লাভ করে।
সমগ্রটির গতি বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিটি অংশের গতির সমষ্টির সমান; সুতরাং বস্তুর পরিমাণ দ্বিগুণ করে বেগ সমান রাখা হলে গতি দ্বিগুণ হবে, আর বেগও দ্বিগুণ করা হলে গতি চারগুণ হবে।
সংজ্ঞা ৩
vis insita, বা বস্তুর সহজাত বল (innate force) হল একটি প্রতিরোধকারী শক্তি, যা দ্বারা কোন বস্তু যে অবস্থায় বর্তমান আছে তা ধরে রাখে, এখন তা স্থিতিশীল বা সরলরেখা বরাবর সমগতিতে চলমান যেভাবেই থাকুক না কেন।
এই বলটি যে বস্তুর মধ্যে নিহিত সেই বস্তুরই সমানুপাতিক এবং তা বস্তুর অকার্যকারিতা সত্ত্বেও পরিবর্তিত হয়না, কিন্তু আমরা কিভাবে বলটিকে কল্পনা করছি তার উপর নির্ভর করে। বস্তুর জড়তা ধর্মের কারণে তা কোন বাঁধার সম্মুখীন না হলে কখনই তার স্থিতিশীল অবস্থার পরিবর্তন করেনা। এই বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করেই এই vis insita নামীয় ধর্মটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি নামে নামাঙ্কিত করা হয়, আর তা হল জড়তা (vis inertiae) বা অকার্যকারিতার বল (force of inactivity)। কিন্তু বস্তু তার এই বলের বহিঃপ্রকাশ তখনই ঘটায় যখন তার উপর অন্য একটি বল প্রযুক্ত হয়ে তার অবস্থার পরিবর্তন করতে সচেষ্ট হয় এবং এই বলের ক্রিয়াকে রোধ বা ঘাত উভয় হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। বস্তুটি তার বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার জন্য প্রযুকব্ত বলকে বাঁধা দেয়, এ হিসেবে তার এই বলটি রোধ; আবার বস্তুটি প্রযুক্ত বলকে অবাধে যাত্রা করার সুযোগ না দিয়ে বরং বলটি যে অবস্থা থেকে এসেছে তাকেই পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালায়, এ হিসেবে তার বলটি ঘাত। সাধারণত স্থির বস্তুর ক্ষেত্রে রোধ এবং গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে ঘাত ধর্মটি আরোপ করা হয়, অবশ্য এটিও নিশ্চিত যে, গতিশীল অবস্থা কেবল সাপেক্ষ বিচারেই নির্ধারণ করা যায়; যে বস্তুকে স্থির ধরা হয় তা অন্য কোন সাপেক্ষ বিচারে স্থির না-ও হতে পারে।
সংজ্ঞা ৪
কোন স্থির বা সরলরেখা বরাবর সমগতিতে চলমান বস্তুর উপর প্রযুক্ত একটি বল হল উক্ত বস্তুর অবস্থা পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগী হওয়া (exert) একটি ক্রিয়া (action)।
সংজ্ঞা ৫
কেন্দ্রমুখী বল হচ্ছে এমন কিছু যার কারণে বস্তুসমূহ কেন্দ্র হিসেবে ধরা যায় এমন কোন বিন্দুর দিকে টান অনুভব করে, তাড়িত হয় বা কোন না কোনভাবে ঝুঁকে পড়তে চায়।
এমন ধরণের কিছু হচ্ছে অভিকর্ষ, যার কারণে বস্তুসমূহ পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে ঝুঁতে পড়তে চায়; চৌম্বকত্ব, যার কারণে লোহা চুম্বকের দিকে ঝুঁকে পড়তে চায়; এবং সেই বল, তা যেরকমই হোক না কেন, যার কারণে গ্রহসমূহ অবিরত ঋজুরেখ গতি থেকে বিচ্যুত হয়ে বক্ররেখ কক্ষপথে পরিভ্রমণ করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যথায় কিন্তু তাদেরকে ঋজুরেখ গতিতেই চলতে হতো। রশির এক প্রান্তে পাথর বেঁধে অন্য প্রান্ত ধরে ঘুরাতে থাকলে তা হাত থেকে ছুটে যাবার চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টার কারণে রশিটি প্রসারিত হয় (যদিও তা বোঝার উপায় থাকেনা – অনুবাদক), ঘূর্ণন বেগ বাড়িয়ে দিলে ছুটে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় বলও বেড়ে যায়; ছুটে যেতে দিলে তাই পাথরটি উড়ে চলে যায়। যে বল নিজেকে এই প্রচেষ্টার বিরোধী হিসেবে উপস্থাপিত করে এবং যার কারণে রশিটি অবিরত পাথরকে হাতের পানে টেনে রাখার মাধ্যমে তাকে কক্ষপথে ধরে রাখে, কারণ হাত এক্ষেত্রে কেন্দ্র হিসেবে নির্দেশিত, তাকেই আমি কেন্দ্রমুখী বল বলছি। কোন কক্ষপথে আবর্তনরত যেকোন বস্তুর ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। তারা সবাই কক্ষের কেন্দ্র থেকে বিপরীত দিকে ছুটে যাবার চেষ্টা করে এবং এই টেষ্টার বিপরীতে ক্রিয়াশীল যে বলকে আমি কেন্দ্রমুখী বল বলছি তা না থাকলে তারা একটি উড়ে চলে যেতো এবং তাদের গতি গতো সরলরেখা বরাবর ও সুষম। অভিকর্ষ বল না থাকলে কোন প্রাস আর পৃথিবীর পানে ফিরে আসতো না, বরং সরলরেখা বরাবর এর আবহমণ্ডল থেকে চলে যেতো এবং বাতাসের বাঁধা সরিয়ে নেয়া হলে তার যাবার গতিটিও হতো সুষম। অভিকর্ষই সেই বল যা তাকে অবিরত ঋজুরেখ গতি থেকে বিচ্যুত করে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনে এবং প্রাসের এই বিচ্যুতি নির্ভর করে তার উপর ক্রিয়ারত অভিকর্ষ বল এবং তার গতিবেগের উপর। প্রাসের উপর ক্রিয়ারত অভিকর্ষ বল যত কম হবে (অর্থাৎ তার পদার্থের পরিমাণ যত কম হবে) ও তার গতিবেগ যত বেশি হবে, তার ঋজুরেখ গতি থেকে সে তত কম বিচ্যুত হবে। এবং সেহেতু সে তত অধিক দূরত্ব অতিক্রম করবে। ধরা যাক, গানপাউডারের শক্তির সাহায্যে পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি লিডেন বলকে নির্দিষ্ট বেগে ভূ-দিগন্তের সাথে সমান্তরালে নিক্ষেপ করা হলে তা বক্র রেখাপথে যাত্রা করে ভূমিতে পড়ার আগে ২ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। এখন যতি বাতাসের বাঁধা অপসারণ করা হয় তাহলেও দেখা যাবে তা এক সময় না এক সময় মাটিতে পড়বেই, হয়তো বেগ দ্বিগুণ বা দশগুণ হয়ে যাওয়ার কারণে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা দশগুণ দূরত্ব অতিক্রম করবে। আমরা বেগ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এর প্রাসের দূরত্ব বৃদ্ধি করতে পারি এবং এর বক্র গতিপথকে করতে পারি আরেকটি সরল, তথাপি এক সময় এটি পতিত হবেই। এই পতন ১০, ৩০ বা ৯০ ডিগ্রি কোন না কোন দূরত্বে ঘটবে, কিংবা তা পতিত হওয়ার আগে প্রায় গোলাকার পথে সমগ্র পৃথিবী চক্কর দিতে পারে অথবা এমনও হতে পারে তা মহাশূন্যের দিকে অগ্রসর হয়ে অসীমের পথে যাত্রা করেছে।
স্বতঃসিদ্ধ, বা গতির সূত্রসমূহ
সূত্র ১
প্রতিটি বস্তুই তার স্থির অবস্থায় অটল থাকে বা সরলরেখা বরাবর সমগতিতে গতিশীল থাকে যতক্ষণ না তার উপর সেই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কোন বল প্রয়োগ করা হয়।
নিক্ষিপ্ত বস্তু (Projectile) সর্বদাই তার গতির আদি অবস্থায় বিরাজ করে, যতক্ষণ না তারা বাতাস কর্তৃক বাঁধার সম্মুখীন হয় বা অভিকর্ষ বলের কারণে নিচের দিকে প্রবর্তিত হয়। একটি লাটিম যার বিভিন্ন অংশ তাদের আসঞ্জনের কারণে ঋজুরেখ গতি থেকে ক্রমান্বয়ে বিচ্যুত হচ্ছে তা বাতাস কর্তৃক বাঁধাপ্রাপ্ত না হলে কখনই তার ঘূর্ণনের গতি হ্রাস করেনা। গ্রহ এবং ধূমকেতুর মত বৃহৎ বস্তুসমূহ প্রায় শূণ্য স্থানে ঘূর্ণায়মান থাকে বিধায় অনেক কম বাঁধার সম্মুখীন হয়। এজন্যই এই বস্তুসমূহের অগ্রগামী এবং ঘূর্ণন উভয় ধরণের গতিই অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী সময় ধরে সংরক্ষিত থাকে।
সূত্র ২
গতির পরিবর্তন সর্বদাই পরিবর্তনের জন্য প্রযুক্ত বলের সমানুপতিক; এবং এই বল যেদিকে প্রযুক্ত হয় গতির পরিবর্তন সেই দিকের সাথে সরলরেখা বরাবর হয়ে থাকে।
কোন একটি বল যদি গতির সৃষ্টি করে তবে তার দ্বিগুণ বল দ্বিগুণ এবং তিনগুণ বল তিনগুণ গতির সৃষ্টি করবে, বলটি একই সময়ে এবং একই সাথে বা ক্রমিক এবং ধারাবাহিক যেভাবেই প্রয়োগ করা হোক না কেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে পুরো বইটিই এখন টেক্সট আকারা ইউকিসোর্সে পাওয়া যাচ্ছে:
- http://en.wikisource.org/wiki/The_Mathematical_Principles_of_Natural_Philosophy_%281846%29
এখান থেকে নিয়ে নিয়ে বাংলা উইকিসংকলনে অনুবাদ করাটা একেবারেই কঠিন হবে না।