ইয়োহানেস কেপলারের জীবনী

উইকিপিডিয়াতে আমিই লিখছি জীবনীটি: উইকিতে দেয়ার পাশাপাশি ভাবলাম এখানেও নিয়মিত প্রকাশ করতে থাকি। আজকে এতটুকু লিখলাম:
————————————————————-
ইয়োহানেস কেপলার ১৫৭১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর ভাইল ডেআ স্টাট নামক একটি ফ্রি ইমপেরিয়াল সিটি-তে জন্মগ্রহণ করেন। হলি রোমান এম্পায়ার-এ যে শহরগুলো কোন প্রিন্স নয় বরং সরাসরি সম্রাট কর্তৃক শাসিত হতো তাদেরকে ফ্রি ইমপেরিয়াল সিটি বলা হতো। বর্তমানে শহরটি জার্মানির স্টুটগার্ট অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। তার পিতামহ সেবাল্ড কেপলার এই শহরের লর্ড মেয়র ছিলেন, কিন্তু কেপলারের জন্মের সময় তার দুই ভাই ও এক বোন ছিল এবং তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটছিল। তার বাবা হাইনরিশ কেপলারের ভাড়াটে সৈনিক জীবন ছিল আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভরপুর, অবশ্য তার বয়স যখন ৫ বছর তখন তিনি পরিবার ছেড়ে চলে যান। নেদারল্যান্ডে সংঘটিত আশি বছরের যুদ্ধে তিনি মারা গিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তার মা কাটারিনা গুল্ডেনমান ছিলেন সরাইওয়ালার মেয়ে, তিনি ভেষজ ঔষধ নিয়ে কাজ করতেন এবং ভিষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে ডাকিনীবিদ্যা চর্চার অভিযোগে তার বিচার হয়েছিল। গর্ভধারণের ৩৮তম সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই কেপলারের জন্ম হয়, যে কারণে শিশুকালে তিনি বেশ দুর্বল ছিলেন এবং নানা অসুখে ভুগতেন। অবশ্য মাতামহের সরাইখানার অনেক পথিককে সেই বয়সেই গণিতের দক্ষতা দেখিয়ে মুগ্ধ করে দিতেন।

বেশ অল্প বয়সেই জ্যোতির্বিদ্যার সাথে পরিচিত হন এবং সারা জীবন জ্ঞানের এই শাখাটির প্রতি তার দুর্বলতা থেকে যায়। ৬ বছর বয়সে তিনি ১৫৭৭-এর মহা ধূমকেতু দেখেন, তার লেখা থেকে জানা যায় ধূমকেতুটি দেখার জন্য মা তাকে একটি উঁচু জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৫৮০ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি আরও একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন, এবার একটি চন্দ্রগ্রহণ। লেখা থেকে জানা যায় চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য তাদেরকে বাইরে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং চাঁদটি লাল দেখাচ্ছিল। কিন্তু শৈশবে গুটিবসন্ত রোগে তার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল ও হাত খোঁড়া হয়ে যায়। এ কারণে পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিদ্যায় তার দক্ষতা বেশ কমে গিয়েছিল।

কেপলার প্রথমে গ্রামার স্কুল, পরে লাতিন স্কুল ও মাউলব্রোনে অবস্থিত ইভানজেলিক্যাল সেমিনারিতে (রোমান ক্যাথলিক যাজকদের প্রশিক্ষণ কলেজ) পড়া শেষে ইউনিভার্সিটি অফ ট্যুবিঙেনের ট্যুবিঙার স্টিফ্ট-এ ভর্তি হন। এখানে তিনি ফিটুস ম্যুলারের অধীনে দর্শন এবং ইয়াকব হিয়ারব্রান্ডের অধীনে ধর্মতত্ত্ব পড়েছেন। হিয়ারব্রান্ড মিখায়েল মায়েস্টলিনকেও পড়িয়েছিলেন যিনি পরবর্তীতে ট্যুবিঙেনের উপাচার্য এবং কেপলারের বড় পৃষ্ঠপোষক হন। কেপলার এখানে চমৎকার গণিতবিদ এবং দক্ষ জ্যোতিষী হিসেবে খ্যাতি পান, এমনকি সহপাঠীদের রাশিচক্র গণনা করেও নাম কুড়িয়েছিলেন। মিখায়েল মায়েস্টলিনের দিক নির্দেশনায় তিনি গ্রহীয় গতি সম্পর্কে টলেমির ধারণা এবং কোপেরনিকুসের ধারণা দুটোই অধ্যয়ন করেন। সে সময় কিছুকালের জন্য কোপারনিকান হয়ে গিয়েছিলেন। ছাত্রদের একটি বিতর্কে সৌরকেন্দ্রিক মতবাদকে সমর্থন করে তিনি এর পক্ষে তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় উভয় ধরণের যুক্তিই উপস্থাপন করেন, বলেন সূর্যই মহাবিশ্বের প্রধান গতিদায়ক ও প্রাণসঞ্চালক। মন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষাজীবনের শেষ দিকে অস্ট্রিয়ার গ্রাৎসে অবস্থিত প্রোটেস্ট্যান্ট স্কুলে (যেটি পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অফ গ্রাৎস হয়) গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। ২৩ বছর বয়সে ১৫৯৪ সালে তিনি পদটি গ্রহণও করে ফেলেন।

কেপলারের প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রন্থ মুস্টেরিয়ুম কসমোগ্রাফিকুম (মহাবিশ্বের পবিত্র রহস্য) ছিল কোপের্নিকুসের বিশ্ব ব্যবস্থা প্রমাণের জন্য প্রকাশিত প্রথম বই। কেপলারের দাবী অনুসারে ১৫৯৫ সালের ১৯শে জানুয়ারি গ্রাৎসের একটি শ্রেণীকক্ষে রাশিচক্রে শনি ও বৃহস্পতি গ্রহের পর্যাবৃত্ত সংযোগ পড়ানোর সময় তার মনে এক স্বর্গীয় চিন্তা খেলে যায়; তিনি বুঝতে পারেন সুষম বহুভুজের অন্তর্বৃত্ত এবং পরিবৃত্ত যেমন বহুভুজটির সাথে সর্বদা একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে আবদ্ধ হয়, মহাবিশ্বের জ্যামিতিক ভিত্তিও সম্ভবত তেমন। এরপর অনেক ধরণের পরীক্ষা করেন, কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহ যোগ করেও শেষ পর্যন্ত সুষম বহুভুজদের এমন কোন সমাবেশ পাননি যা তখন পর্যন্ত জানা জ্যোতিষ্কগুলোর গতিপথ ব্যাখ্যা করতে পারে। অগত্যা ত্রিমাত্রিক বহুতলক নিয়ে কাজ শুরু করেন। এভাবে আবিষ্কার করেন যে, পাঁচটি প্লেটোনীয় ঘনবস্তুকে খ-গোলকের মাধ্যমে অন্তর্লিখিত এবং পরিলিখিত করা যায়। তিনি বস্তুগুলোর একটিকে আরেকটির ভেতর স্থাপন করে প্রতিটিকে একটি অন্তর্বৃত্ত ও একটি পরিবৃত্ত দ্বারা আবদ্ধ করেন। এক বস্তুর অন্তর্বৃত্ত তার পরের বস্তুটির পরিবৃত্তের সাথে মিলে একটি খ-গোলক গঠন করে। এভাবে পাঁচটি বস্তুর জন্য মোট ছয়টি গোলক পাওয়া যায়। তখন পর্যন্ত জানা ছয়টি গ্রহকে (বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনি) কেপলার এই ছয় গোলকে স্থান করে দেন। অষ্টতলক, বিংশতলক, দ্বাদশতলক, চতুস্তলক এবং ঘনক- এই বস্তু পাঁচটিকে সঠিক ক্রমে সাজিয়ে দেখেন, গোলকগুলোকে এমন দূরত্বে স্থাপন করা সম্ভব যাতে তা গ্রহীয় কক্ষপথের আপেক্ষিক আকারের প্রতিনিধিত্ব করে। অবশ্যই সে সময়কার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দূরত্বের যে মান পাওয়া গিয়েছিল সেটাই তাকে ব্যবহার করতে হয়েছে। এমনকি কেপলার প্রতিটি গ্রহের খ-গোলকের সাথে তার কক্ষীয় পর্যায়কালের সম্পর্কসূচক একটি সূত্রও আবিষ্কার করে ফেলেন: ভেতর থেকে বাইরের দিকে যেতে থাকলে কক্ষীয় পর্যায়কালের বৃদ্ধি পরস্পরসংলগ্ন গ্রহ দুটির কক্ষীয় ব্যাসার্ধ্যের পার্থক্যের দ্বিগুণ। পরে অবশ্য সঠিক মান নির্ণয়ে সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে তিনি এই সূত্রটি পরিত্যাগ করেছিলেন।

বইয়ের শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় কেপলার ভেবেছিলেন তিনি মহাবিশ্বের জ্যামিতি নিয়ে ঈশ্বরের মহাপরিকল্পনা বুঝে ফেলেছেন। কোপের্নিকুসের বিশ্ব-ব্যাবস্থা নিয়ে তার এত আগ্রহের কারণ ছিল মূলত আধ্যাত্মিক বা ধর্মতাত্ত্বিক, তিনি ভৌত বিশ্বের সাথে আধ্যাত্মিক জগতের সম্বন্ধ খুঁজে পেতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি ভাবতেন মহাবিশ্ব নিজেই ঈশ্বরের একটি ছবি, যেখানে সূর্য পিতা, তারাসমূহের খ-গোলক পুত্র, আর মাঝের স্থানটুকু পবিত্র আত্মা। বাইবেলে ভূকেন্দ্রিক মতবাদ সমর্থন করা হচ্ছে মনে হলেও তিনি সৌরকেন্দ্রিক মতবাদের সাথে বাইবেলের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে মুস্টেরিয়ুমের প্রথম পাণ্ডুলিপিতে একটি পৃথক অধ্যায়ই লিখেছিলেন।

তার পৃষ্ঠপোষক মিখায়েল মায়েস্টলিনের সমর্থন ও সাহায্যে তিনি ট্যুবিঙেন ইউনিভার্সিটি থেকে পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের অনুমতি পান, তবে শর্ত ছিল বাইবেলের চুলচেরা বিশ্লেষনসমৃদ্ধ অধ্যায়টি বাদ দিয়ে তার বদলে কোপের্নিকুসের বিশ্ব-ব্যবস্থার একটি সহজবোধ্য ব্যাখ্যা ও তার নিজের নতুন ধারণাগুলোর সাধারণ পরিচিতি লিখতে হবে। ১৫৯৬ সালে বইটি প্রকাশিত হয়, ১৫৯৭-এ তিনি নিজের কপিগুলো হাতে পান এবং বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে পাঠাতে থাকেন। খুব বেশি পাঠকপ্রিয়তা না পেলেও বইটি কেপলারকে একজন উঁচুমানের জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। তার আত্মনিবেদন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় গ্রাৎসে তার পৃষ্ঠপোষকরা সন্তুষ্ট হয় এবং ভৌগলিকবাবেই তার পৃষ্ঠপোষকতা বেড়ে যায়।

পরবর্তী কাজের সুবাদে বেশ কিছু পরিবর্তন আনলেও কেপলার কখনো প্লেটোনীয় ঘনবস্তুর উপর ভিত্তি করে নির্মীত তার এই বিশ্বতাত্ত্বিক মডেলটি বর্জন করেননি। পরবর্তী জীবনে তার অনেক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক কাজের উদ্দেশ্যও ছিল মডেলটিকে আরও সূক্ষ্ণ ও কার্যকরী করে তোলা, বিশেষ করে গ্রহগুলোর সঠিক উৎকেন্দ্রিকতা নির্ণয়ের মাধ্যমে খ-গোলকগুলোর অন্তর্ব্যাসার্ধ্য ও বহির্ব্যাসার্ধ্যের আরও সঠিক মান নির্ণয়ের ব্রত ছিলেন। ১৬২১ সালে তিনি মুস্টেরিয়ুমের একটি বর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন। প্রথমটির প্রায় অর্ধেক পরিমাণ বেশি দীর্ঘ এবং বেশ কিছু সংশোধন ও পাদটীকার মাধ্যমে গত ২৫ বছরে তার অর্জন ও উপলব্ধিগুলো এই সংস্করণে তুলে ধরেন।

মুস্টেরিয়ুমের প্রভাব সম্পর্কে প্রথম কথা হচ্ছে, এটি ছিল কোপের্নিকুসের তত্ত্বের আধুনিকায়নের পথে প্রথম পদক্ষেপ। De revolutionibus orbium coelestium গ্রন্থে কোপের্নিকুস যে সৌরকেন্দ্রিক একটি মডেল তৈরি করার চেষ্টা করেছেন সে নিয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেটি করতে গিয়ে তাকে টলেমীয় পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হয়েছে, গ্রহগুলোর কক্ষীয় বেগ ব্যাখ্যা করতে অণুবৃত্ত ও উৎকেন্দ্রিক বৃত্তের ধারণা তুলে ধরতে হয়েছে। উপরন্তু কোপের্নিকুস নিজেও সূর্যের কক্ষপথের কেন্দ্রের বদলে পৃথিবীর কক্ষপথের কেন্দ্রকে প্রসঙ্গ বিন্দু হিসেবে উল্লেখ করে যাচ্ছিলেন। তার নিজের লেখাতেই এর কারণ হিসেবে পাওয়া যায়, “হিসাবের সুবিধা এবং টলেমির বিশ্ব থেকে খুব বেশি সরে গিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করে না দেয়ার জন্য”। সেহেতু মুস্টেরিয়ুম কসমোগ্রাফিকুমের তত্ত্ব ভুল হলেও নিঃসন্দেহে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নতির পেছনে তার বিশাল ভূমিকা আছে। কারণ এই গ্রন্থই কোপের্নিকুসের সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে টলেমির শেষচিহ্ন বিলুপ্ত করে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে।

About Khan Muhammad

A man's heart has heard two ways through life- the way of nature and the way of grace. You have to choose which one you'll follow. Grace doesn't try to please itself. It accepts being slighted, forgotten, disliked. It accepts insults and injuries. Nature only wants to please itself, get others to please it too. It likes to lord it over them; to have its own way. It finds reasons to be unhappy when all the world is shining around it and love is smiling through all things. They taught us, that no one who loves the way of grace, ever comes to a bad end.
This entry was posted in জীবনী. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s